শাহরিয়া হৃদয়ঃ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা পেতে চলন্ত বাস চালানোর সময় ভিডিও ধারণ করে ফেসবুক ও টিকটকে প্রকাশের প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। সচেতন মহলের আশঙ্কা, এমন কর্মকাণ্ড চালকদের মনোযোগ নষ্ট করার পাশাপাশি যাত্রী ও পথচারীদের জীবনকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলছে। সম্প্রতি কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
গত সোমবার বিকেল সোয়া ৩টার দিকে পাকুন্দিয়া উপজেলার সুখিয়াবাজার এলাকায় ঢাকা-কিশোরগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কে অনন্যা ক্লাসিক পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে গরুবোঝাই একটি পিকআপের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে পিকআপে থাকা নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার কুন্দারপাড়া গ্রামের বিল্লাল হোসেন (৩৫), আবু সাইদ (৩৯) ও আবদুস ছোবহান (৩৯) নিহত হন। আহত হন আরও তিনজন। দুর্ঘটনায় সাতটি গরুও মারা যায়। খবর পেয়ে পাকুন্দিয়া ফায়ার সার্ভিস ও থানা পুলিশ উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দুর্ঘটনায় জড়িত বাসটি ঢাকা-কিশোরগঞ্জ রুটে চলাচলকারী অনন্যা ক্লাসিক পরিবহনের। দুর্ঘটনার পর বাসটির চালক সুজনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রম নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
সুজনের ফেসবুক আইডি পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলন্ত অবস্থায় বাস চালানোর সময় ধারণ করা প্রায় অর্ধশতাধিক ভিডিও সেখানে প্রকাশ করা হয়েছে। বিভিন্ন ভিডিওতে বাস চালানোর সময় ভিডিও ধারণ ও উচ্চগতিতে গাড়ি চালানোর দৃশ্য দেখা যায় বলে অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে তার অনুসারী হিসেবে থাকা আরও কয়েকজন চালকও একই ধরনের ভিডিও নিয়মিত প্রকাশ করছেন।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই বাসের নিয়মিত যাত্রী পরিচয়ে অনেকেই মন্তব্য করে অভিযোগ করেছেন, চালক প্রায়ই অতিরিক্ত গতিতে বাস চালাতেন। ভিডিও তৈরির জন্য কখনো ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, কখনো উল্টো পথে চলাচল করতেন বলেও অভিযোগ করেন তারা। যাত্রীরা প্রতিবাদ করলে তাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করা হতো বলেও কয়েকজন মন্তব্যে উল্লেখ করেছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট চালকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
স্থানীয়দের দাবি, ঢাকা-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কে বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং ট্রাফিক আইন অমান্যের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। চলতি বছরের জুন মাস থেকে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত শুধু পাকুন্দিয়া উপজেলাতেই সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ১৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছে।
দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে সুশীল সমাজ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বেপরোয়া গতি, তিন চাকার যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, চালকের অমনোযোগ, হঠাৎ বাঁক নেওয়া, ট্রাফিক আইন অমান্য এবং সড়ক ব্যবহারে সচেতনতার অভাবকে দায়ী করছেন।
এ বিষয়ে পাকুন্দিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম আরিফুর রহমান বলেন, "ঢাকা-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কটি প্রশস্ত হওয়ায় যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে। যাত্রীবাহী বাস, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, ট্রাক, সিএনজি, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলের অনেক চালকই অতিরিক্ত গতিতে যান চালান। অধিকাংশ চালক ট্রাফিক আইন মেনে চলেন না। মামলা করার পরও অনেক চালকের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হচ্ছে না। নির্ধারিত গতিসীমা অমান্য করার কারণেই দুর্ঘটনা বাড়ছে।"
সড়ক নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের মতে, চলন্ত গাড়ি চালানোর সময় ভিডিও ধারণ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য কনটেন্ট তৈরির প্রবণতা বন্ধে কঠোর নজরদারি ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। পাশাপাশি চালকদের ট্রাফিক আইন মেনে চলতে বাধ্য করা এবং নিয়মিত মনিটরিং জোরদার করা হলে সড়ক দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।




