কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটার উৎসব এখন বিষাদে পরিণত হয়েছে। গত তিন দিনের টানা অতিবৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে কৃষকের কষ্টের সোনালী ফসল। বিশেষ করে জেলার অষ্টগ্রাম উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন হাজারো কৃষক।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) সকাল থেকে বৃষ্টির তীব্রতা বাড়লে হাওরের নিচু এলাকার জমিগুলোতে হু হু করে পানি ঢুকতে শুরু করে। অষ্টগ্রাম উপজেলার খয়েরপুর-আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নে খোয়াই নদীর উপচে পড়া পানি ঢুকে তলিয়ে গেছে শত শত একর পাকা ধানক্ষেত। কৃষকরা আধা-পাকা ও পাকা ধান কোনোমতে রক্ষার চেষ্টা করলেও পানির প্রবল স্রোতে তা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনেকের স্বপ্নের ফসল এখন পানির নিচে পচে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। শুধু মাঠের জমি নয়, বৃষ্টির কারণে ধান শুকানোর ‘খলা’ বা চাতালগুলোতেও পানি জমে গেছে। ফলে আগে কাটা ধান মাড়াই করা বা শুকিয়ে ঘরে তোলা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বৃষ্টির কারণে কাটা ধান ক্ষেতেই স্তূপ করে রাখা হয়েছে, যা দীর্ঘ সময় ভিজে থাকলে অংকুরোদগম বা পচে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকায় বর্তমানে কম্বাইন্ড হারভেস্টার মেশিন দিয়ে ধান কাটা চলছিল। কিন্তু জমিতে পানি জমে যাওয়ায় এবং মাটি কাদা হয়ে যাওয়ায় যন্ত্র দিয়ে ধান কাটা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। শ্রমিকের সংকট এবং চড়া মজুরির কারণে হাতে ধান কাটা কৃষকদের জন্য বাড়তি ব্যয়ের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিকলী আবহাওয়া অফিসের সিনিয়র অবজারভার আক্তার ফারুক জানান, মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত মাত্র ৬ ঘণ্টায় ৯০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগের দিন সোমবার ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টির পরিমাণ ছিল ২০ মিলিমিটার। আগামীকালও এই বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, অষ্টগ্রাম উপজেলায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। তবে এর বাইরে ইটনা, মিঠামইন, নিকলী, তাড়াইল, করিমগঞ্জ ও বাজিতপুর উপজেলার হাওর এলাকাগুলোতেও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। অনেক জায়গায় পানি সরার বদলে উল্টো বাড়ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে কিশোরগঞ্জের ১৩ উপজেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৮১ হেক্টর জমিতে। এ বছর জেলায় চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ লাখ ৯৬ হাজার ৬৮৬ টন, যার বড় অংশই আসার কথা হাওর অঞ্চল থেকে। এখন পর্যন্ত কৃষকেরা হাওরাঞ্চলের ৫০ পার্সেন্ট বোরোধান কাটতে পেরেছে।
হাওরপাড়ের কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, "প্রত্যাশা ছিল গোলাভরা ধানের, কিন্তু বন্যায় সব স্বপ্ন আজ ম্লান। একদিকে ফসলের হানি, অন্যদিকে বাজারে ধানের কম দাম ও শ্রমিকের উচ্চমূল্য—এই দুইয়ের চাপে পড়ে কৃষকের পিঠ আজ দেয়ালে ঠেকে গেছে। এখন লাভের আশা ছেড়ে আবাদের খরচটুকু তুলে আনাই এক প্রকার অসম্ভব।"
কৃষক আলতাফ আলী গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বর্তমানে সামান্য বৃষ্টি বা উজানের পাহাড়ি ঢল নামলেই সেই পানি সরাসরি হাওরে প্রবেশ করে ফসল তলিয়ে দিচ্ছে। নদীগুলোর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি ধারণ ও নিষ্কাশন ক্ষমতা হারিয়ে গেছে। যত্রতত্র বাঁধ এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের ফলে পানি বের হওয়ার স্বাভাবিক পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে। প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হওয়ায় প্রতিবছর ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে।
অষ্টগ্রামের খয়েরপুর-আব্দুল্লাহপুর এলাকার কৃষক দুলাল মিয়া বলেন, অকাল ও অতিবৃষ্টি আমাদের সব স্বপ্ন কেড়ে নিচ্ছে। শত শত একর জমির কাঁচা-পাকা ধান এখন চোখের সামনেই অথৈ পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। বুক ফেটে যাচ্ছে অথচ আমাদের কিছুই করার নেই। অনেক জমিতে পানি এতটাই বেড়ে গেছে যে, ধান কাটার মেশিন নামানো তো দূরের কথা, মানুষ নামানোও দায় হয়ে পড়েছে। সারাবছর হাড়ভাঙ্গা খাটুনি দিয়ে এই ফসল ফলিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম এবার গোলায় ধান তুলব, অভাব দূর হবে। কিন্তু কুদরত আমাদের সহায় নেই। পানির স্রোতে সোনার ফসল তলিয়ে যাচ্ছে আর আমরা পাড়ে দাঁড়িয়ে কেবল তাকিয়ে আছি। এই ফসলই আমাদের সারা বছরের আহার, অথচ চোখের সামনে সব শেষ হয়ে যাচ্ছে দেখে আমরা একদম অসহায় হয়ে পড়েছি।”
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান জানান, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অষ্টগ্রামের খয়েরপুর-আব্দুল্লাহপুর এলাকায় খোয়াই নদীর পানি ঢুকে পাকা ধানক্ষেত তলিয়ে গেছে। গতকাল পর্যন্ত হাওরাঞ্চলে প্রায় ৫০ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছিল।
এদিকে কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন জানান, এখনো হাওরের পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেনি। তবে টানা বৃষ্টিতে পানি বাড়ছে। আগাম বন্যার হাত থেকে বাঁচতে ধান ৮০ শতাংশ পাকলেই কৃষকরা কেটে ঘরে তুলতে সেইজন্য আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া ছিল।



