কিশোরগঞ্জ জেলাজুড়ে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে হামের সংক্রমণ। গত তিন মাসে আক্রান্ত ও সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ২৫০ ছাড়িয়েছে। প্রতিদিন নতুন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় পরিস্থিতি মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ। প্রতিনিয়তই হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে শিশু ভর্তি হওয়ায় অভিভাবকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের দেওয়া তথ্যমতে, গত জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত কিশোরগঞ্জে অন্তত ২৪৮ জন হামে আক্রান্ত হয়ে বা হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ৭৭ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। সন্দেহভাজন রোগীদের মধ্য থেকে ৭৭ জনের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল, যার মধ্যে ১৮ জনের শরীরে হামের ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। অত্যন্ত সংক্রামক এই ব্যাধিতে জেলায় ইতোমধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, আক্রান্তদের আলাদা রেখে চিকিৎসা দিতে জেলায় মোট ১০১টি আইসোলেশন বেড প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ২৬টি বেড; শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৫টি বেড; উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১২টি ও উপজেলার প্রতিটিতে ৫টি করে মোট ৬০টি বেড। তবে জেলায় উন্নত মানের আইসিইউ সুবিধা না থাকায় গুরুতর রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ বা ঢাকার হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হচ্ছে, যা দরিদ্র পরিবারের জন্য বাড়তি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে আগামী ২০ এপ্রিল থেকে কিশোরগঞ্জসহ সারাদেশে হামের টিকাদান কর্মসূচি শুরু হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, জেলায় টিকার কোনো সংকট নেই। এই কর্মসূচির বিশেষত্ব হলো আগে যারা টিকা নিয়েছেন, তারাও সুরক্ষার খাতিরে পুনরায় টিকা নিতে পারবেন।
চিকিৎসকদের মতে, পুনরায় টিকা গ্রহণে কোনো ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি নেই, বরং এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করবে।
হামে আক্রান্ত শিশু লামিয়া আক্তারের অভিভাবক জামাল উদ্দিন বলেন, ‘দেশের বিভিন্নস্থানে হামে মৃত্যু ও আক্রান্তের খবরে আমরা চিন্তিত হয়ে পড়েছি। বাচ্চাদের জ্বর, ঠাণ্ডা, কাশি ও হালকা র্যাশ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছি। চিকিৎসায় দিন দিন তারা সুস্থ হয়ে উঠেছে।’
সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লিভার, পরিপাকতন্ত্র ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. মুহাম্মদ আবিদুর রহমান ভূঞা বলেন, ‘হাম একটি বায়ুবাহিত অত্যন্ত সংক্রামক রোগ।’
কোনো শিশুর মধ্যে যদি কাশি, জ্বর, নাক দিয়ে পানি পড়া বা শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়, তবে দেরি না করে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
জেলা সিভিল সার্জন ডা. অভিজিৎ শর্মা বলেন, ‘আমরা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। সংক্রমণ শনাক্তে নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে। ২০ তারিখের টিকাদান কর্মসূচি সফল হলে সংক্রমণের হার দ্রুত কমে আসবে বলে আমরা আশা করছি। অভিভাবকদের প্রতি অনুরোধ, লক্ষণ দেখা দিলেই যেন শিশুকে আইসোলেশনে রাখা হয় এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া হয়।’
‘বর্তমানে জেলার ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদেরও সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে; যাতে গ্রামীণ এলাকায় সংক্রমণের খবর দ্রুত সদর দপ্তরে পৌঁছায়।’




